ঢাকা, বুধবার   ১৭ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৪ ১৪৩১

গল্প : পোড়া ইটের জীবন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬:৪৬, ৩১ মার্চ ২০২৪  

গল্প : পোড়া ইটের জীবন

গল্প : পোড়া ইটের জীবন

নীলয় কাজ শেষে সব রিপোর্ট রেডি করে নিচ্ছে একটি ফাইলের মধ্যে। সফট কপি ম্যানেজারকে মেইল করেছে। হার্ড কপিতে স্বাক্ষর লাগবে। ম্যানেজারের ডেস্কে ফাইলটা রেখে আসতেই রাবেয়া চৌধুরীর কল আসে-
কোথায় তুমি?
অফিসে, বের হবো একটু পর। কেন?
তুমি অফিস থেকে বের হয়ে ঢাকায় আসো। জরুরি।
আল্লাহ বলো কি? কীভাবে যাবো? তাছাড়া কাল আমার অফিস আছে।
নীলয়! এত কিছু কিন্তু আমি বুঝি না। তোমাকে আমার চাই। তুমি আসো। রাতে আমার সাথে থাকবে। তুমি এলে আমরা একসাথে খাবো। ভোরে তোমাকে আমার ড্রাইভার খুলনায় নামিয়ে দিয়ে আসবে।
খুব বেশি জরুরি কিছু না হলে বৃহস্পতিবার রাতে আসি। দুই রাত তোমার সাথে থাকবো, আড্ডা দেবো। শনিবার ভোরে চলে আসবো।
আমি এত কিছু বুঝি না। তোমাকে আমার দেখতে ইচ্ছে করছে। ছুঁতে ইচ্ছে করছে। তুমি এখনই আসো।

শুধু টাকাই নয়, রাবেয়াকেও ভালো লাগে নীলয়ের। এর মূল কারণ হতে পারে নীলয়ের বয়স কম। সবে ২৮ বছরের তরুণ। রাবেয়া চৌধুরী সাতচল্লিশে পা দিয়েছে। তবে দেহের বয়স ঠিক যেন সেই ছত্রিশ। মনের বয়স তো একুশ। নীলয়কে কাছে পেলে প্রথম যৌবনের ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে রাবেয়ার। হৃদয়টা তরতর করে ওঠে। কাঁচা মাংসের ঘ্রাণে দম বন্ধ হয়ে আসে। মনের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে দাউদাউ করে।

নীলয় ঝুঁকি নিতে চাইলো না। পরের দিন ম্যানেজারের কাছে ছুটি চাইবে ভাবলো। কিন্তু হুট করে গিয়ে কী বলবে ম্যানেজারকে? ভাবতে ভাবতেই মাথায় একটা প্ল্যান এসে ধরা দেয়। সে কম্পিত দেহ নিয়ে ম্যানেজারের ডেস্কে যায়-
স্যার, সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার বড় মামা বাথরুমে পরে গিয়ে কোমর ভেঙেছে।
উফ, দুঃখজনক নীলয় সাহেব। হাসপাতালে নিতে বলেন।
হ্যাঁ, নিয়ে যাচ্ছে অলরেডি। তবে স্যার, আমি মামাকে একটু দেখতে যেতাম।
অবশ্যই যাবেন। এত বড় দুর্ঘটনা। আপনি অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে চলে যান। কাছে টাকা আছে? টাকা লাগলে নিতে পারেন!
না স্যার, টাকা আছে। আমি তাহলে আসি স্যার। আসসালামু আলাইকুম।

অফিসের মূল গেটের বাইরে এসে সত্যি সত্যিই নীলয় হাঁপাচ্ছিল। কী অভিনয় রে বাবা! এই প্রথম নীলয় এত বড় মিথ্যা বলল। তখনো শরীর থরথর করে কাঁপছিল। সেই কাঁপুনি যেন আরও বেড়ে গেল রাবেয়ার ফোনে-
নীলয় তোমার ফোনের মেসেজ চেক করো। আমি তোমাকে বিকাশে তেরো হাজার টাকা পাঠিয়েছি। তুমি একটা প্রাইভেটকার নিয়ে দ্রুত এসো। আসার সময় আমার জন্য ফুল আনতে ভুলো না।

নীলয় একদম নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। সত্যি বলতে তার বেতনের অর্ধেক টাকা রাবেয়া পাঠিয়েছে বিকাশে। চোখ বড় বড় হয়ে যায় নীলয়ের। রাবেয়া তো নীলয়কে বিয়ে করবে না। সেটা সম্ভবও নয়। তার দুটি বিবাহিত ছেলে ও একটি অবিবাহিত মেয়ে আছে। শুধু স্বামীর থেকেই ছাড়াছাড়ি হয়েছে। তাছাড়া বেশ গোছানো সংসার রাবেয়ার। মেয়ে বিয়ের পর আমেরিকায় স্বামীর সাথে থাকে। ছোট ছেলেটা বুয়েট থেকে পাস করার পরপরই কানাডায় ভালো চাকরি পেয়ে যায়। ছয় মাস পর কানাডিয়ান এক তরুণীকে বিয়ে করে সেখানেই সেটেল্ড। বড় ছেলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আছে। ঢাকায় মিরপুরে দুটি ফ্লাট ভাড়া দেওয়া। গুলিস্তানের মতো জায়গায় নিজস্ব বাসভবন। অথচ রাবেয়া সাভারে ছয়তলা একটা বিল্ডিংয়ের চারতলার ফ্লাটে ভাড়া থাকে। বড় ছেলে রাবেয়াকে হাতখরচের কিছু টাকা দেয়। কিন্তু গুরুত্ব দেয় না। মন চাইলে সাভারে আসে, না চাইলে না আসে। ছোট ছেলেটা কানাডা থেকে মায়ের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা পাঠায়। রাবেয়ারও নিজস্ব ক্যাশ আছে ব্যাংকে। বেলাশেষে খাওয়ার মানুষ নেই। বাসায় একজন ড্রাইভার ও দুজন কাজের লোক আছে। তাদের নিয়েই থাকে রাবেয়া। হুট করে মেসেঞ্জারে পরিচয় হয় নীলয়ের সাথে। কথা হয়। আড্ডা হয়। ছবি, ভিডিও এবং অডিও কল সব হয়। দুজনের একাকিত্ব দুজন মিলে দায়িত্ব নিয়ে দূর করে।

একদিন কথা বলতে বলতেই নীলয়ের ফোনটা হাত থেকে পড়ে যায়। ডিসপ্লে নষ্ট হয়ে যায়। শোনার পর রাবেয়া পয়তাল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে একটি ল্যাপটপ কিনে কুরিয়ার করে। ততদিনে তাদের চ্যাটিংয়ের বয়স মাত্র সতেরো দিন। নীলয় কুরিয়ার থেকে পার্সেলটা বাসায় এনে খোলার পর অবাক হয়। অবিশ্বাস্য লাগে। ল্যাপটপ কার্টুন থেকে বের করতেই অনেকগুলো এক হাজার টাকার নোট বের হয়। নীলয়ের চোখ তখন কপালে। নিজেকে চিমটি কাটে। আসলে ঘুমের মধ্যে নেই তো? সব টাকা গুছিয়ে গুনে দেখা গেল ছাব্বিশ হাজার। সাথে ছোট একটি চিরকুট। তাতে একটি নিউ মডেলের মোবাইল ফোনের নাম লেখা।

নীলয় বেতন পাওয়ার পর একটি সুন্দর লাল রঙের শাড়ি ও কিছু কাচের চুড়ি কিনে কুরিয়ার করে রাবেয়ার ঠিকানায়। রাবেয়া সেগুলো পেয়ে অনেকটা হেসেছে। কারণ লাল শাড়ি আর কাচের চুড়ি সে পরা বাদ দিয়েছে তা-ও কুড়ি বছর হবে। রাতে নীলয়ের নতুন ফোনে ভিডিও কল দিলে রাবেয়াকে ধন্যবাদ জানায়-
একদম না। নো থ্যাংকস।
তুমি আমাকে ল্যাপটপ ও ফোন দিয়েছো। আমি কি তোমাকে। ওহ সরি, তুমি করে বলে ফেলেছি।
প্লিজ নীলয়, তুমি আমাকে সব সময় তুমি করেই ডেকো।
ইয়ে মানে, আপনি তো মানে তুমি তো...
কী? কী আমি বলো? আমাকে তোমার ভালো লাগে না নীলয়?
হ্যাঁ লাগে, কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব?
এখানে অসম্ভবের কিছু নেই নীলয়। আমি তো তোমার কাছে কিছু চাই না। না কোনো অর্থকড়ি, না কোনো অধিকার। আমি শুধু তোমাকে একটু দেখতে চাই। কথা বলতে চাই। তোমাকে আমার ভালো লাগে।
শাড়ি পছন্দ হয়েছে?
হুম, খুব।
পরেছিলে?
না পরিনি। কার জন্য পরবো? তুমি যদি কোনো দিন আমার বাসায় আসো; সেদিন পরবো।

প্রায় ছয় মাস হয়েছে ওদের সম্পর্ক। প্রতি মাসে নীলয় দু’তিনবার রাবেয়ার কাছে যায়। গিয়ে দেখে আসে। ঢাকায় রাবেয়াকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। রাতে আবার রাবেয়ার নিজস্ব গাড়িতে করে নীলয়কে খুলনায় রেখে যায় তার ড্রাইভার। নীলয়ের জন্য উত্তরায় একটি ফ্ল্যাট দেখছে রাবেয়া। উপহার দেবে। শুধু রাবেয়ার ইচ্ছা, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নীলয় তার কাছে থাকুক। তাকে ভালোবাসুক। আগলে রাখুক।

নীলয়ও তাই করছে। কখন কীভাবে যেন রাবেয়ার প্রেমে পড়েছে। রাবেয়ার কাছে গেলে মনে হয় একটা অবুঝ বালিকা। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে নীলয়ের দিকে। খাবার টেবিলে তুলে খাওয়ায়। বিছানায় যাওয়ার আগে গুনগুন করে গান গায় আয়নার সামনে। সাজে। সাজতে নাকি তার খুব ভালো লাগে। সাজলে এই বয়সেও রাবেয়ার দিকে তাকানো যায় না। চোখে লজ্জারা এসে পড়ে। কী অপরূপ ভদ্রমহিলা। এই বয়সেও শরীরের কোথাও কোনো ভাঁজ নেই। লম্বা কালো চুলে পিঠ ছেয়ে যায়। টানা টানা চোখগুলো নীলয়কে রুমের ড্রিম আলোয় গিলে খেতে চায় যেন।

রাবেয়া নীলয়ের মায়ায় পড়েছে। প্রেম-ভালোবাসার কোনো বয়স লাগে না। যার প্রমাণ তারা। দুজন দুজনার চোখের দিকে তাকিয়ে কীভাবে যেন একাকার হয়ে যায়। নীলয়ের ভালোবাসায় রাবেয়ার বয়স নেমে এসে একুশে দাঁড়ায়। নীলয়কে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে রাখে রাবেয়া। আহা, পোড়া হৃদয়ে যেন একটুখানি সজীবতা দেখা দেয়। সতেজ হয়ে ওঠে পুরোনো দিনের সেই কাম। কিন্তু ঠিক তখনই মস্তিষ্কে ভেসে ওঠে কুলাঙ্গারটার মুখচ্ছবি। যাকে জীবনের সমস্ত কিছু দিয়ে ভালোবেসেছিল রাবেয়া। সে এখন লন্ডনে হাঁটুর বয়সী একটি ইংরেজ তরুণীকে নিয়ে সংসার পেতেছে। ভাবতেই রাবেয়ার হৃদয়ে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। সেই আগুন নীলয়ের ভালোবাসার কাছে নিমিষেই শীতল হয়ে আসে। রাবেয়ার বুকটা হালকা লাগে। নীলয়ের মাথাটা বুকের ওপর নিয়ে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে রাখে রাবেয়া। এসব ভাবতে ভাবতে একটু যেন হাসি পায় রাবেয়ার।নীলয় পদ্মা সেতু পার হওয়ার আগেই রাবেয়া আবার কল করে-
কতদূর তুমি?
পদ্মা সেতুর কাছাকাছি।
আচ্ছা, সাবধানে এসো।
পদ্মা সেতু পার হয়ে পনেরো মিনিটও হয়ে ওঠেনি নীলয়ের মা ফোন করেছেন-
বাবা রে, বাবা আমার। ও বাবা, তোমার বড় মামা ট্রাকের সাথে ধাক্কা লেগে মারা গেছে। বাবা গো, ও বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসো বাবা। বাবা গো।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়