ঢাকা, বুধবার   ১৭ এপ্রিল ২০২৪ ||  বৈশাখ ৪ ১৪৩১

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরছে ছাত্র রাজনীতি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২:১৮, ২ এপ্রিল ২০২৪  

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরছে ছাত্র রাজনীতি

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরছে ছাত্র রাজনীতি

নিষিদ্ধ ঘোষণার চার বছর পাঁচ মাস ২১ দিন পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আবার ফিরছে ছাত্র রাজনীতি। গতকাল সোমবার ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের আদেশ স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। 

এদিকে, ছাত্রলীগ আদালতের আদেশকে ‘যুগান্তকারী রায়’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বিপরীতে ছাত্রদল ও বাম সংগঠনগুলো এর মাধ্যমে ফের ‘ছাত্রলীগের দখলদারিত্বের সূচনা’ বলে মনে করছে।

হাইকোর্টের এ আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাসের আকাঙ্ক্ষা’ আদালতে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ রশীদ প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা। সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি না থাকার যৌক্তিকতা ও দাবির বিষয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ ও অটল। ছাত্র রাজনীতিহীন বুয়েটের পরিবেশ ছিল সর্বোচ্চ নিরাপদ ও শিক্ষাবান্ধব। মৌলবাদী শক্তিকেও আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দিতে পারি। তারা বলেন, গত চার বছরে শিক্ষকদের থেকে আমরা কখনোই এমন অনুভব করিনি যে তারা রাজনীতি ফেরত চান। এ সংকটে আমরা শিক্ষকদের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি, তারা যেন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান। এ ব্যাপারে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এ কে এম মনজুর মোর্শেদ বলেন, সাধারণভাবে আদালতের রায় আমাদের অবশ্যই মানতে হবে। আমরা আলোচনা করে শিক্ষকদের অবস্থান জানাব। তবে শিক্ষার্থীদের চাওয়ার বিষয়ে সভায় আলোচনা হবে। ছাত্র রাজনীতি ক্যাম্পাসে থাকবে কিনা– এ বিষয়ে এখনই কিছু বলতে চাই না।

বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কোর্ট যেটা বলবেন, আমাদের সেটা মানতে হবে। কোর্টের আদেশ শিরোধার্য। আমরা আদালত অবমাননা করতে পারব না।’

হাইকোর্টে স্থগিত

বুয়েটে রাজনীতি নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত চেয়ে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ আদেশ দেন।
ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার বিজ্ঞপ্তির কার্যকারিতা স্থগিত করার পাশাপাশি বুয়েট কর্তৃপক্ষের ওই আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেন আদালত। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, বুয়েট উপাচার্য ও রেজিস্ট্রারকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

এর আগে সকালে বুয়েটে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি করার অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সম্পূরক রিট আবেদনটি করা হয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক ও জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম সুজন এমপি। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সমরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আবুল কালাম খান দাউদ। এ বিষয়ে আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, বুয়েট কর্তৃপক্ষ তাদের ক্যাম্পাসে রাজনীতি বন্ধ করে যে নোটিশ দিয়েছিল, সেটিই স্থগিত করেছেন আদালত।

২০১৯ সালে বুয়েট প্রশাসন যখন ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে, তখন ছাত্রলীগ নেতা ইমতিয়াজ হোসেন রাব্বি ওই বিজ্ঞপ্তি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট করেছিলেন। ওই রিটের সম্পূরক আবেদনের পর গতকাল শুনানি শেষে আদেশ দেন হাইকোর্ট।

আগেও রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল

যে অধ্যাদেশ অনুযায়ী বুয়েট পরিচালিত হয়, এর ১৬ ধারা অনুযায়ী ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ। ১৯৮৯ সালের বুয়েটের একাডেমিক কাউন্সিল অধ্যাদেশটিতে সর্বশেষ সংশোধনী এনেছিল। এর ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, ডিএসডব্লিউর লিখিত অনুমোদন ছাড়া ক্যাম্পাসে কোনো ক্লাব বা সোসাইটি বা ছাত্র সংগঠন (বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্টস ইউনিয়ন, ডিপার্টমেন্ট বা হল অ্যাসোসিয়েশন ছাড়া) গঠন করা যাবে না। তবে এটি সেভাবে কার্যকর ছিল না।
২০০২ সালের ৪ জুন বুয়েটে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে নিহত হন কেমিকৌশল বিভাগের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি। এরপর ২০ জুলাই একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় অধ্যাদেশের ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ-সংক্রান্ত ধারাটি বাস্তবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়। সেদিন থেকে ক্যাম্পাসে সভা-সমাবেশ ও মিছিল বা কর্মসূচি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে বুয়েট কর্তৃপক্ষ।

২০০২ সালে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা শেষে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ অনুসারে বুয়েট শিক্ষার্থীরা কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে বা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না। এই শৃঙ্খলাবিধি তাদের যথাযথভাবে পালন করতে হবে। এটি অমান্য করলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ২০০৯ সাল থেকে বুয়েট ক্যাম্পাসে ফের প্রকাশ্য ছাত্র রাজনীতি শুরু হয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর আবার ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল।

‘যুগান্তকারী রায়’ বলছে ছাত্রলীগ

হাইকোর্টের এ আদেশের বিষয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেন, শিক্ষা ও মৌলিক অধিকারবিরোধী যে সিদ্ধান্ত বুয়েটে নেওয়া হয়েছিল, এর বিরুদ্ধে আমরা রাজনৈতিকভাবে আন্দোলনের পাশাপাশি আইনের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। ছাত্র রাজনীতির মধ্যে কোনো নেতিবাচক উপাদান থেকে থাকলে বা একাডেমিক কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাজনীতি নিশ্চিত করার জন্য বুয়েট প্রশাসন যদি কোনো নিয়মনীতি প্রণয়ন করে, আমরা সেটিকে স্বাগত জানাব। যে কোনো মূল্যে আমরা বুয়েটে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি দেখতে চাই।

সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান বলেন, গণতন্ত্র ও সংবিধানের পক্ষে এ রকম একটি যুগান্তকারী রায় ঘোষণার জন্য আদালতকে ধন্যবাদ। আমরা বুয়েটে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি চালুর চেষ্টা করব।

বিশিষ্টজন কী বলছেন

বুয়েট সিন্ডিকেট সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাজনীতির সম্পৃক্তি চায় না, কোনোভাবেই রাজনীতির নামে অপরাজনীতির সুযোগ যেন ক্যাম্পাসে না থাকে।

তিনি বলেন, রাজনীতি থেকে যদি শিক্ষার্থীদের বিচ্ছিন্ন করা হয়, তাহলে তাদের মধ্যে মানবিক গুণাবলি থাকবে না। তারা অমানবিক হয়ে পড়বে, এটা কাম্য নয়। সুষ্ঠু রাজনীতির অভাব বিভিন্ন জায়গায় দেখতে পাই, সেটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতি-ভীতি তৈরি করে। আমরা শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে দেখতে চাই, রোবট হিসেবে নয়। একজন শিক্ষার্থী প্রকৌশল জ্ঞানে শিক্ষিত হবে তা নয়, সত্যিকার অর্থে ভালো মানুষ হয়ে উঠতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় যেন অপরাজনীতির আবর্তে না পড়ে, সে ব্যাপারে সজাগ থাকা দরকার। সেখানেই সমাধান নিহিত।

বুয়েট অ্যালামনাইয়ের সভাপতি ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত বলেন, আমার দুঃখ লাগছে, বুয়েটের ক্যারেক্টার বদলে গেল। প্রথা বলে একটা বিষয় রয়েছে, আইন যা-ই থাকুক। তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর অধীনে যখন দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্ট রিভাইজ করা হয়, বুয়েট ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনুরূপ পরিবর্তন চাইলেও বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন, এ দুটি ইউনিভার্সিটি কারিগরি, এগুলো আলাদা হবে। এগুলোকে অন্য ইউনিভার্সিটির মতো করা যাবে না। তিনি অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এগুলো বদলানোর মত দেননি। পরে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান জানিয়ে কেউ এ প্রথা বদলাননি। জাতির পিতার ধারণাকে আমাদের সম্মান জানানো দরকার।

তিনি বলেন, বুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্যাটার্ন আলাদা। এখানে হয়তো দশজন কোনো পার্টির প্রতি অনুরক্ত। এদের সংখ্যা ২ শতাংশের বেশি হবে না। আমি ডিএসডব্লিউ থাকাকালে নব্বইয়ের দশকে জামায়াত-শিবির সদস্য ৪০-৫০ জন বেশি ছিল না। আমার কাছে তালিকা ছিল। কাজেই বুয়েটের চরিত্র যেন না বদলায়।

তিনি আরও বলেন, সরকারের অনেকে বলছে, এখানে সন্ত্রাসী অনেক। আপনাদের গোয়েন্দা সংস্থা আছে। কোন ছেলেটা ইসলামিক সন্ত্রাসীর অংশ, আপনারা তাকে গ্রেপ্তার করেন; নিয়ন্ত্রণ করেন। দেশের আইন এবং বুয়েট এদেরকে সমর্থন করে না।

বুয়েট ছাত্রলীগ সাবেক নেতাদের সংবাদ সম্মেলন

আন্দোলনের নামে বুয়েটে অচলাবস্থা সৃষ্টির দায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীর নামে হিজবুত তাহ্‌রীর, শিবির ও উগ্র মৌলবাদের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা। এ সময় পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন তারা।

গতকাল বুয়েট প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক থেকে বের হয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা। আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক ও আইইবির সভাপতি প্রকৌশলী আবদুস সবুরসহ বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

প্রকৌশলী আবদুস সবুর বলেন, বুয়েটের আপামর ছাত্রছাত্রীরা জঙ্গি ও মৌলবাদীদের সব সময় প্রতিরোধ করে, যার প্রমাণ আমরা বারবার পেয়েছি। জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী অবস্থানের জন্য ছাত্রলীগ নেতা ও বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আরিফ রায়হান দীপকে নজরুল ইসলাম হলে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করার পর এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা সন্ত্রাসকে প্রতিহত করেন। ফলে ক্যাম্পাসে সনি ও আবরার হত্যাকারীদের ঠাঁই হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করছি, প্রগতির চাকাকে উল্টে দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে বুয়েটে বারবার বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
সর্বশেষ
জনপ্রিয়