ঢাকা, বুধবার   ০৬ জুলাই ২০২২ ||  আষাঢ় ২১ ১৪২৯

ভাষার বিশুদ্ধ চেতনা: মনসুর মুসা

শিল্প ও সাহিত্য ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩:৫২, ১৮ জুন ২০২২  

সংগৃহীত

সংগৃহীত

কিছু মানুষের সংস্পর্শে গেলে সব সময়ই ভালো লাগে। মনে হয় আরও কিছু সময় তার সংস্পর্শে কাটিয়ে আসি—কিছু কথা শুনি, নিজেকে ঋদ্ধ করি। এই মহান মানুষেরা সর্বময় জ্ঞানদান করে তাদের ছাত্রছাত্রীদের পৌঁছে দিতে চান শীর্ষে। এটা যে যেভাবে গ্রহণ করবে, সে সেভাবেই নিজেকে সমৃদ্ধ করে তুলবে। আমি বলছি তেমনই একজন মানুষ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও ভাষাতাত্ত্বিক মনসুর মুসা স্যারের কথা। আমরাই তাকে প্রথম পেয়েছিলাম গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলা বিভাগে যখন তিনি ডিন হয়ে আসেন। অবশ্য তার আগেও তিনি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন।

আমি অনেক আগে থেকেই এই মহান মানুষের নামের সাথে পরিচিত ছিলাম। কেননা সর্বপ্রথম কবি অতীন অভীক আমাকে ঝিনাইদহের কবি ও গল্পকার শহীদুর রহমানের কথা বলেছিলেন। যার বিখ্যাত ছিল বিড়াল গল্প। পরবর্তীতে তার বিড়াল গল্পের নামে বইও প্রকাশিত হয়েছিল। এই শহীদুর রহমানের মৃত্যুর পরে তাকে নিয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ করা হয়, সেটি সম্পাদনা করেছিলেন মনসুর মুসা ও জিয়া হায়দার। এই প্রথম স্যারের নামের সাথে পরিচিতি—তারও পূর্বে বোধহয় শিক্ষক ও গবেষক মাহমুদ শাহ কোরেশী স্যারের মুখে তার কিছু কথা শুনেছি।

অনেক বইয়ের ভূমিকায় তার নাম দেখেছি। কারণ তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক ভাষা ইনিস্টিটিউটেও তিনি কর্মরত ছিলেন। এই মানুষটিকে পেয়ে আমি ভেতরে ভেতরে একটু বেশিই উৎফুল্ল হয়েছিলাম। এমন ভাষাতাত্ত্বিক মানুষের সংস্পর্শ পাওয়াটাও তো ভাগ্যের ব্যাপার। ছাত্রাবস্থায় তিনি আমার হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কেটেছেন। ডিন অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে গণ’র খোলা খেলার মাঠ দেখা যেত—আমরা সেখানে নিয়মিত ভিড় জমাতাম। কোনদিন ডিন অফিসে আমাদের কাজ থাকত না। তবুও স্যারকে দেখার জন্য সামনে ঘোরাঘুরি করতাম—সে ঘোরাটাও কয়েকদিনের। পরে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করে বের হয়ে আসি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসার বেশ কিছুদিন পর আবার গিয়েছিলাম লেখাপড়ার প্রমাণপত্র আনতে। কারণ সে সময় আমি লক্ষ্মীপুর ভবানীগঞ্জ ডিগ্রি কলেজে যোগদান করেছি। স্যারের রুমে ঢুকতেই চিনলেন এবং বললেন, ‘কেমন চলছে দিন—লেখালেখি কিছু কি হচ্ছে?’ ‘চলছে স্যার, কলেজেও জয়েন করেছি বাংলার শিক্ষক হিসেবে।’ জানতে চাইলেন, ‘কোথায়?’ লক্ষ্মীপুর শুনতেই স্যার জানালেন, ‘এত দূর?’ পরে স্যারের সাথে কাজ শেষ করে রুম থেকে বের হয়ে আসি। স্যার শুধু একটি কথাই বললেন, ‘লেগে থাকো, হাল ছেড়ে দিও না।’ আমি সেই কথাটি আজও মনে রেখেছি।

কয়েকদিন আগেও স্যারের সঙ্গে দেখা হলো। স্যার গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে আছেন। মাঝে শুনেছিলাম তিনি স্ট্রকও করেছিলেন। সেই সাথে বয়সেরও তো একটি বিষয় সব সময় থেকে যায়। স্যারের রুমে ঢুকতেই কয়েস স্যার (বাংলা বিভাগের প্রথম ছাত্র। আমাদের বড় ভাই। পরে তিনি বাংলা বিভাগে যোগ দিয়েছেন) আমাকে স্যারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ‘স্যার, এ আমাদের ছাত্র—আলীনূর। বঙ্গ রাখাল নামে লেখালেখি করে।’ স্যার কিছু সময় মুখের দিখে তাকিয়ে থাকলেন। কথা শুরু হলো। আমি আমার ‘ছোটবোয়ালিয়া-জয়ন্তীনগর-বসন্তপুর গণহত্যা’ (মুক্তিযুদ্ধের গবেষণা), ‘কবিতার করতলে’ (প্রবন্ধ) ও ‘কবিতায় ঘর-বসতি’ (প্রবন্ধ) বই তিনটি দিলাম। স্যার বইগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলেন এবং বললেন, ‘আপনারা যারা লেখালেখি করছেন, তারা কবি তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে কেন লেখেন না?’ আমি বললাম, ‘স্যার, আমার প্রিয় কবি-লেখকদের মধ্যে তসলিমাও একজন। তাকে নিয়ে একটা লেখাও আমি লিখেছি।’ স্যার তখন বললেন, ‘আমার তো আপনার সাথে এর আগেও কথা হয়েছে। আপনি কোন কলেজে যেন চাকরি করতেন? সেখানে আছেন না অন্য কোথাও ঢুকেছেন?’ তখন জানালাম, ‘স্যার, আমি কলেজের চাকরি ছেড়ে একটি বেসরকারি চাকরি করছি।’ বাসার কথা জানতে চাইলেন। বললাম, ‘মিরপুর-২।’ গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের কথা বলতেই তিনি বললেন, ‘ওখানে তো আমার একটা বন্ধু থাকতো।’ তার কথার লেশ ধরেই বললাম, ‘স্যার, আমি জানি। আপনি শিক্ষক ও গল্পকার শহীদুর রহমানের কথা বলছেন। আপনি যে তার মৃত্যুর পরে একটা স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনা করেছিলেন সেটাও জানি এবং সেটা আমার সংগ্রহেও আছে।’ এবার স্যারের সাথে কথার পর্ব শেষ করে বের হয়ে এলাম।

রুম থেকে বের হয়ে আসতে আসতে মনে পড়ল, কী মানুষ আর কী হয়ে গেছেন। তবুও একটি বিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন গভীর মনোযোগে। এই বয়সে এসেও তিনি তার দায়িত্ব থেকে এতটুকু ক্ষ্যান্ত দেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠবাদাম বৃক্ষতলে বসে মনে করার চেষ্টা করলাম স্যারের কোনো বই কি সত্যিই আমি পড়েছি। তখন মনে পড়ে গেল, মুক্তধারা প্রকাশনী থেকে ১৯৮৪ সালে শিল্পী হাশেম খানের প্রচ্ছদ করা একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। বইটির নাম ‘ভাষা পরিকল্পনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’। এই গ্রন্থে দশটি প্রবন্ধ ছিল। বাংলা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, বাংলাদেশের ভাষাপরিস্থিতি, বাংলা ভাষালেখা প্রথম বাংলা ব্যাকরণ, তুর্কী ভাষা-আন্দোলন, ভাষাতাত্ত্বিক ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ঔপনিবেশিক ভাষানীতি প্রসঙ্গে, ভাষার বিশুদ্ধতা, ভাষা পরিকল্পনা, বাংলা ভাষা ও প্রশাসনিক নির্দেশ, বাংলা প্রচলন সংক্রান্ত বিবেচনা।

বইটি যে কেউ হাতে নিলেই হয়তো ভয়ে কিছুটা শিহরিত হয়ে উঠবেন—ভাষা হয়তো কত কঠিনই বা হয়ে উঠবে। কিন্তু বইটা পড়তে শুরু করলেই সারল্যতা নিয়ে শুধু পড়েই যেতে ইচ্ছে করবে। ভূমিকা একটু পড়ে নিলেই আমরা বুঝতে পারব—‘ ভাষা কাকে বলে এবং কাকে বলে না এ ধরনের দার্শনিক কূটতর্কে অবতীর্ণ না হয়ে আমরা শুধু স্বীকার করে নেবো যে, ভাষা হচ্ছে মানুষের এক ধরনের মস্তিষ্কজাত মানবীয় ক্ষমতা, যা সামাজিক আবহাওয়ায় পরিপুষ্ট হয়ে মানুষের সামাজিক মানবত্বকে প্রতিষ্ঠা দান করে। জৈবিক মানুষ যখন সামাজিক মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিল তখন থেকেই ভাষা মানব-জীবনের অপরিহার্য উপকরণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল।’

এভাবেই বইয়ের লেখা কত সহজ-সরল বাক্যের মধ্য দিয়ে তিনি শুরু করেছেন—আমাদের ভাষার গুরুত্ব কিংবা ভাষার তৎপর্যের কথা তার এই লেখার মাধ্যমে সব পাঠকের কাছেই তিনি তুলে ধরছেন। তিনি ভাষা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজ করেছেন এবং এই ভাষার তাৎপর্য মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টাও করে চলেছেন এখনো। তবে এই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার ভাষার ব্যবহার নিয়ে অনেক ক্ষোভ আছে। তিনি সেই ১৯৮৪ সালেই বলেছেন, ‘বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ভাষাতত্ত্ব চর্চার গুরুত্ব নানাভাবে স্বীকৃত হয়েছে। অনুন্নত দেশ বলে আমাদের দেশে ভাষাতত্ত্বের বহুমুখী গুরুত্ব স্বীকৃত হয়নি। অবশ্য ‘লবণ আনতে পান্তা ফুরায়’ যে দেশে সেখানে ভাষাতত্ত্বের মতো প্রত্যক্ষ উৎপাদন কর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীন বিষয় কম আলোচিত হওয়াই মঙ্গলজনক। তবে ভাষাতাত্ত্বিক জাতীয়তাবাদ যে দেশে শ্লোগান, যেখানে ভাষা একটি মৌলিক রাজনৈতিক হাতিয়ার সেখানে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য হলেও কিঞ্চিৎ ভাষাতত্ত্বের চর্চা অধিক হওয়া উচিত ছিল। (তাহলে আমাদের দেশে ভাষার অপব্যবহার যে পরিমাণ বেড়েছে সেটা হতো না)।’

আমাদের দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান ভাষা নিয়ে কাজ করলেও তাদের কাজ সেভাবে চোখে পড়ার মতো নয়। আমাদের প্রতিনিয়ত ভুল এবং অশুদ্ধ শব্দের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যে দেশের রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চালিত হয় বায়ান্ন থেকে—সেখানকার ভাষার ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের কোন বিধি-নিষেধ নেই। টেলিভিশন, বেসরকারি রেডিওগুলোয় হরহামেশা তাদের ইচ্ছামতো বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করে থাকেন। আসলে ইতিহাস হাতড়ে দেখতে গেলে আমাদের এই ভাষা ঐতিহাসিকভাবেই অবজ্ঞার বিষয় হয়ে দেখা দিয়েছে—এমনকি এখনো এই ভাষা অবহেলার পাত্র। বাংলায় যারা পড়ালেখা করেন, তাদের করুণ অবস্থা দেখলেও কিছুটা অনুমান করা যায়।

আর্যদের কাছে সব সময়ই এই ভাষা ছিল ‘পাখির ডাকের মতো অস্পষ্ট’। তাদের সময়ে বেশি মর্যাদাপূর্ণ ভাষাছিল সংস্কৃত ভাষা। শাসক পুরোহিত বা অভিজাতদের ভাষাই ছিল সংস্কৃত। সমাজের নিম্নগোছের মানুষেরা এই ভাষা কখনো চর্চা করতে পারতো না। কারণ তারা চর্চা করলেই তাদের রৌরব নামে এক ধরনের নরকের নিকৃষ্টতম জায়গায় নিক্ষেপ করা হতো। এভাবেই নানা ভাবে তাদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে রাখা হয়েছে—এভাবেই শাসক সম্প্রদায় ভাষাকে সত্যিকার অর্থেই বিকশিত হতে দেয়নি। এই ভাষার অপমানজনক ব্যবহার নিয়েও লেখক মনসুর মুসা অনেক আফসোস করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়োবৃদ্ধ শিক্ষকও ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে এক ধরনের জগাখিচুড়ি ভাষা ব্যবহার করে থাকেন।

সদ্য আগত নবীন অধ্যাপক বিনয়াবনত কণ্ঠে বলেন যে, বহুদিন পর বাংলা বলতে একটু তার অসুবিধা হচ্ছে, কিন্তু শিগগিরই তিনি চমৎকার রপ্ত করতে পারবেন। এই আমাদের ভাষার হাল। এভাবেই তিনি তার ‘ভাষা পরিকল্পনা ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ গ্রন্থে ভাষা নিয়ে অনেক কথাই ধারাবাহিকভাবে বলে গেছেন। কারণ আমরা যে ভাষার ওপর নির্ভর করেই সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি—সে জায়গাটাই নড়বড়ে হলে আমরা একদিন মুখ থুবড়ে পড়ব। তাই ভাষাকে রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব। আমাদের সন্তানদের ভাষার তাৎপর্য তুলে ধরে তাদের ভাষার প্রতি মমতা বাড়াতে হবে। আর এভাবে লাগামহীন ভাষার যাচ্ছেতাই চলতে থাকলে ভাষাহীন মানব একদিন দানবে রূপান্তরিত হবে। তবে ভাষাতত্ত্বের বিষয়টি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অনুধ্যানীত হলেও তা আজ অনেকটা অনালোচিতও বটে।

আবারও মনসুর মুসা স্যারের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে হয়, ভাষার বিশুদ্ধিচেতনা ব্যাপারটি পুরাপুরি ভাষাতাত্ত্বিক নয়, সমাজতাত্ত্বিক। ভাষাকে সমাজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে বিশ্লেষণ করতে হবে, সমাজবিচ্ছিন্ন করে নয়।

সর্বশেষ
জনপ্রিয়